10 23 17

সোমবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং | ৮ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) | ২রা সফর, ১৪৩৯ হিজরী

Home - কৃষি খামার ও উদ্দ্যোক্তা - সিরাজুল দেওয়ান অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে স্বাবলম্বি

সিরাজুল দেওয়ান অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে স্বাবলম্বি

তেঁতুলিয়ায় অর্গানিক পদ্ধতিতে স্বল্প জমিতে শাক-সবজি চাষাবাদ করে স্বাবলম্বি বাউল সিরাজুল ইসলাম দেওয়ান।

এলাকায় বাউল শিল্পী হিসেবে পরিচিত সিরাজুল ইসলাম দেওয়ান, বয়স অনুমান ৫৫ বছর। পেশায় সংস্কৃতিমনা একজন সাদামাঠা মানুষ। তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কানকাটা গ্রামে তার পৈতৃক নিবাস। গত শুক্রবার সকালে সরেজমিন গিয়ে জানা যায় পিতা মরহুম ইসমাইল মিয়ার দু’ সংসারে ৬ ভাই ২ বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

দর্জিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণি পাশ করেন। শৈশব থেকে ইচ্ছা ছিল লেখা-পড়া শেষে বড় একজন শিল্পী হবে। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর সংসারে ভাইয়েরা পৃথক সংসার শুরু করেন। তখন বৃদ্ধা মায়ের সংসারের হাল ধরেন সিরাজুল। সংসারের খরচ যোগাতে ২টি দেশি গরুর দুধ দহন করে পরিবারের ভরন পোষন করেন। লেখা-পড়া ছেড়ে বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলেও বাড়িতে বড় ভাইয়ের ফিলিপস রেডিওতে নিয়মিত গানের অনুরোধের আসর শুনতেন।

এছাড়া ১২শত টাকা দিয়ে একটি টেপ রেকর্ড কিনে পল্লীগীতি, দেহতত্ত, আদ্ধাত্তিক, বিরহ-বিচ্ছেদ, মাছভান্ডারি ও লালনগীতি গানের নিয়মিত চর্চা করেন। আশপাশের গ্রামের লোকজন তাকে বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের জন্য নিয়ে যান। একপর্যায়ে এলাকার মুরব্বী ফয়েজ উদ্দীনের মাধ্যমে শালবাহান হাটে রওশন সার্কাস দলে যোগদান করেন। সার্কাস দলে দু’মাস থাকার পর বাড়িতে ফিরে আসেন। পরে উপজেলা সদর হাসপাতালের কুষ্ঠু ও যক্ষ্মা প্রোগ্রামসহ সরকারি বিভিন্ন প্রোগ্রামে গান পরিবেশন সহ বাঁশের বাঁশি বাজায়ে বেড়ান। কিন্তু প্রোগ্রামে গান-বাজনা করলেও দলের অন্যান্য সদস্যরা কোন টাকা-পয়সা দেয়নি। চা-নাস্তা খাওয়ায়ে বিদায় দিত।

এভাবে সংসারের খরচাদি বহন করতে না পারায় ২০০০ সালে তেঁতুলিয়া রওশনপুরে কাজী এন্ড কাজী টি এসেস্ট কোম্পানীতে ৩৫ টাকা দিন মঞ্জুরীতে চাকুরি নেন। সেখানে বিভিন্ন দেশি ফসলের বীজ সংগ্রহ সহ অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ সম্পর্ক প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত শাক-সবজি সহ পণ্যসামগ্রী নিয়মিত ঢাকা মিনা বাজারে আদান প্রদান করেন। এই প্রতিষ্ঠানে ৭ বছর চাকুরির পাশাপাশি গাজ-বাজনার চর্চা ধরে রাখেন। কিন্তু চাকুরিতে বেতন কম পাওয়ায় চাকুরি ছেড়ে চলে আসেন।

একদিন তেঁতুলিয়া চৌরাস্তা বাজারে ঠাকুরগাঁও জেলার লোকমান হকার ক্যান্সভান্স করে আশিসাফা নামে (মুরগী, মানুষের ব্যথার) ঔষধ বিক্রি করেন। এই হকারের সংগে পরিচয় হলে সপ্তাহে সোমবার ও শুক্রবারে হাটের দিনে দু’একটি গান পরিবেশন করে রাতে লোকমানের সংগে সংগীতের চর্চা করেন। লোকমান হকার নিজেও ঠাকুরগাঁও বেতার কেন্দ্রে গান করতেন জেনে পরবর্তীতে সিরাজুল ইসলাম দেওয়ান মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও বেতার কেন্দ্রে তার মাধ্যমে গান পরিবেশের সুযোগ পান। দেওয়ানের গানে মুগ্ধ হয়ে ঠাকুরগাঁও বেতার কেন্দ্রের পরিচালক তাকে ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করেন। এর কিছুদিন পর তিনি শ্বাস-ক্রীয়া রোগে আক্রান্ত হলে তার সংগীত চর্চা থেমে যায়। বর্তমানে শারীরিক সুস্থ কিন্তু সংগীত চর্চার যন্ত্রপাতির অভাবে মনের মত সংগীত চর্চা করতে পারছে না বলে জানান।

এদিকে সংসারে ২ কন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে পরিবারের ভরন পোষন যোগাতে হীমসীম খেতে হয়। পিতার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৫৭ শতক জমি থাকলেও হালের গরু না থাকায় চাষাবাদ করতে পারেনি। এই জমি নিজ হাতে কোঁদাল দিয়ে কোপায়ে সবুজ সার, ছাই ও গোবর সার দিয়ে সম্পুন্ন অর্গানিক পদ্ধতিতে দেশি জাতের লাল শাক, ডাটা শাক, চাল কুমড়া, লাউ, ঝিংগা, ঘেরা, ঢেড়স ও মরিচ সহ নানা জাতের শাক-সবজি চাষাবাদ শুরু করেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় উক্ত জমি ছোট ছোট বেডে বিভক্ত করে অর্গানিক পদ্ধতিতে একাধিক শাক-সবজি চাষাবাদ করছেন। জমি তৈরির জন্য তাকে সহযোগিতা করেন ভাগিনা জাহাংগীর, স্ত্রী ও ২ কন্যা। উক্ত জমিতে সবজি চাষাবাদে বীজ ও শ্রমিক সহ প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু জমির উৎপাদিত সবজি বিক্রি হবে কমপক্ষে লক্ষাধিক টাকা।

সিরাজুল ইসলাম দেওয়ান শাক-সবজি চাষাবাদে কোন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেনি। সবজি চাষাবাদে পোকা-মাকড় দমনের জন্য ধুপ জ্বালিয়ে ধোঁয়া ব্যবহার করেন। এছাড়া সবজি বাগানে কোন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন না। বাউল সিরাজুল জানান- বর্তমান বাজারে যেসব কৃষকের শাক-সবজি সব বিক্রি হয়। সেগুলোতে অনেক কীটনাশকের ব্যবহার হয়েছে। ফলে সবজির প্রকৃত সাধ নষ্ট হয়েছে এবং খেতে সাধও নাই। আমার ক্ষেতের সবজি সম্পুন্ন দেশিও পদ্ধতিতে চাষাবাদ করায় সাধে ও গুণে ভাল জেনে বাজারে নেওয়ার সাথে সাথে বিক্রি হয়ে যায়। এখান থেকে তার শাক-সবজি চাষাবাদে আগ্রহ বেড়ে যায়। কিন্তু অর্থনৈতি অভাব অনটনের কারণে সঠিস সময়ে বীজ সংগ্রহ করে শাক-সবজির চাষাবাদ করতে পারছে না। তাই

সরকারি ভাবে তাকে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা পেলে বড় আকারে অর্গানিক পদ্ধতিতে শাক-সবজি চাষাবাদ করে এলাকার চাহিদা পুরণ করতে পারবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জাহাংগীর আলম বলেন- তেঁতুলিয়ার বেলে দো-আঁশ উর্বর জমিতে নানা জাতের ফসল ও ফল উৎপাদনের উপযোগী। বর্তমানে কীটনাশকের মাত্রারিক্ত ব্যবহার করে শাক-সবজি চাষাবাদ করায় পুষ্টির গুণগত মান বজায় থাকছে না। বরং মাত্রারিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে উৎপাদিত শাক-সবজি ক্যান্সার সহ নানা ধরণের রোগ মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে।

এক্ষেত্রে সিরাজুল ইসলাম দেওয়ান সম্পুন্ন দেশিয় সার, বীজ ব্যবহার করে অর্গানিক পদ্ধতিতে শাক-সবজি চাষাবাদ করছে তার এই উদ্যোগ সত্যি প্রশংসনীয়। কারণ কীটনাশক ছাড়া অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদকৃত শাক-সবজি মা ও শিশু সহ সবার স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভাল এবং স্বাস্থ্য সম্মত। তিনি উপজেলার শাক-সবজি চাষীদের কীটনাশক ব্যবহার পরিহার করে দেওয়ানের মত অর্গানিক পদ্ধতি শাক-সবজি চাষাবাদে আগ্রহী হওয়ার পরামর্শ দেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য