Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!
09 20 18

বৃহস্পতিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ৯ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী

Home - রংপুর বিভাগ - সৈয়দপুর হানাদার মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর

সৈয়দপুর হানাদার মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর

১৮ ডিসেম্বর। একাত্তর সালের এ দিনে সৈয়দপুর হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর দুর্বার আক্রমণে পর্যদুস্ত হয়ে হানাদার পাক বাহিনী ও তাদের অবাঙ্গালী দোসর সৈয়দপুর শহরে জড়ো হয়ে দুর্ভেদ্যব্যুহ গড়ে তোলে।

App DinajpurNews Gif

যৌথ বাহিনী নীলফামারী জেলার (তৎকালীণ মহাকুমা) ডোমার উপজেলার (তৎকালীণ থানা) ভারতীয় সীমান্ত ক্যাম্প হিমকুমারী থেকে মিত্র বাহিনী নীলফামারী শহরের নটখানায় ক্যাম্প স্থাপন করে। এর আগেই বিনা লড়াইয়ে ১৩ ডিসেম্বর নীলফামারী শত্রুমুক্ত হয়। ১৮ ডিসেম্বর সকালে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী যৌথভাবে ট্যাংক বহর নিয়ে সৈয়দপুর শহরের ওয়াপদা এলাকায় অবস্থান নেয়।

এর নেতৃত্বে ছিলেন মিত্র বাহিনীর কমান্ডার কর্নেল জোগল ও মেজর কান্ত পাল এবং মুক্তি বাহিনীর ৬নং সেক্টরের সি সাব সেক্টরের কমান্ডার কাপ্টেন ইকবাল ও মুক্তি বাহিনী দলের যুদ্ধকালীন কমান্ডার সামসুল হক সরকার। এ বহর থেকে মিত্র বাহিনী সৈয়দপুর সেনা নিবাসে তার বার্তায় হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে আত্মসমর্পনের নির্দেশ পাঠানো হয়। এরপর বিনা বাঁধায় মিত্র বাহিনী সৈয়দপুর সেনা নিবাসে প্রবেশ করে পাক বাহিনীকে নিরস্ত্র করে।

এর পরই হানাদার মুক্ত হয় সৈয়দপুর। ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রু মুক্ত হলে অবাঙ্গালী অধ্যুষিত সৈয়দপুরে বিজয় আসে ২ দিন পর ১৮ ডিসেম্বর। মুক্তি বাহিনী দলের তৎকালীণ যুদ্ধকালীন কমান্ডার সামসুল হক সরকার জানান, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী ও পার্বতীপুর থেকে মার খেয়ে পাক বাহিনী সৈয়দপুর সেনা নিবাসে আশ্রয় নেয়। এ সময় তাদের দোসর অবাঙ্গালী, রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনী সৈয়দপুর শহরে জড়ো হয়।

ফলে তাদের মোকাবেলার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে বিজয়ের দু’দিন পর সৈয়দপুর প্রবেশ করে যৌথ বাহিনী। তবে যুদ্ধের সব প্রস্তুতি থাকলেও হানাদার পাকবাহিনী যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে। বীরমুক্তিযোদ্ধা ও সৈয়দপুর স্মরণিকা পরিষদের সম্পাদক শাহাজাহান আলী জানান, সৈয়দপুর হানাদার মুক্ত হওয়ার খবরে বিজয়ের আনন্দে মুক্তি পাগল হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। এদিন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তৎকালীণ আওয়ামী লীগ নেতা কাজী ওমর আলী আ.লীগ অফিস ও সৈয়দপুর পৌর সভায় স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেন। এ সময় তিনিসহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল উপস্থিত ছিলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ১৮ ডিসেম্বর সৈয়দপুর হানাদার মুক্ত দিবস একটি ঐতিহাসিক দিন।

এ দিবসটি বিশেষ করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পালন করা উচিত। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও দিনটি পালনে তারা নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। ফলে নিরবে নিভৃতে হারিয়ে যাচ্ছে মুক্ত দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। সৈয়দপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার জিকরুল হক জানান, ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রু মুক্ত হলেও সৈয়দপুর তখনও হানাদার মুক্ত হয়নি। সৈয়দপুরকে মুক্ত করতে এদিন সকালে মুক্তিবাহিনীর একটি কনভয় দিনাজপুর সড়ক হয়ে শহরের কুন্দলে আসে। এ বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢোকার মুহূর্তে হানাদার বাহিনী ও সশস্ত্র অবাঙ্গালী বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

হানাদার অবাঙ্গালীদের সশস্ত্র আক্রমণে শহীদ হন কামারপুকুর ইউপির ব্রহ্মোত্তর গ্রামের তরুণ যোদ্ধা মো. মমতাজ ও মুক্তি বাহিনীর বীরমুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন। গোটা শহর সশস্ত্র অবাঙালীদের দখলে থাকায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত মিত্র বাহিনীর হাতে পতন হয় সৈয়দপুরের। একাত্তর সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর অবাঙালী অধ্যূষিত সৈয়দপুরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরী। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। এই দিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে সারা সৈয়দপুরে পাকিস্তানী পতাকার বদলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। স্বাধীন বাংলার পতাকা দেখে পাকিস্তানের দোসর অবাঙালীরা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে।

হামলার টার্গেট হয়ে ওঠে মুক্তিকামী বাঙালীরা। অবাঙালীরা শহরে জুড়ে নির্বিচারে নিরস্ত্র বাঙালী নিধনে মত্ত হয়ে ওঠে। অবাঙালীদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে শহরের বাঙালীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। অবরুদ্ধ বাঙালীদের মুক্ত করতে হাজার হাজার গ্রামবাসী শহর ঘেরাও করে। ২৪ মার্চ হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। সে দিনের অসম যুদ্ধে পাকিস্তানের দোসর অবাঙালীদের গুলিতে শহীদ হন চিরিরবন্দর উপজেলার (তৎকালীন থানা) সাতনালা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহসী যোদ্ধা মাহাতাব বেগ, বোতলাগাড়ী ইউপির পোড়াহাট গ্রামের অকুতোভয় যুবক মোশারফ হোসেন ও সৈয়দপুরে রেল কারখানার শ্রমিক মোহাম্মদ আলীসহ অজ্ঞাত অনেকে।

এ প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল সৈয়দপুর প্রথম প্রত্যক্ষ সশস্ত্র লড়াই। ২৫ মার্চ শহরের নতুন বাবুপাড়ার নট সেটেলমেন্ট পুলিশ ব্যারাকে বাঙালী পুলিশের উপর সশস্ত্র অবাঙালীরা অতর্কিত আক্রমণ চালায়। উভয় পক্ষের গোলাগুলির মুখে অবাঙালীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। হতাহত বাঙালী পুলিশরাও ব্যারাক ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এসব প্রতিরোধ যুদ্ধের ঢেউ সৈয়দপুর সেনানিবাসে তৃতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মাঝে পৌঁছায়। ৩১ মার্চ রাত ১০টায় সেনানিবাসে পাঞ্জাবী রেজিমেন্ট বাঙালী সৈনিকদের উপর আক্রমণ চালায়। শুরু হয় বাঙালী ও পাঞ্জাবী রেজিমেন্টের মধ্যে মরণপন যুদ্ধ। কিন্তু পাঞ্জাবী সৈন্যদের ভারী অস্ত্রের মুখে বাঙালী সৈন্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে অসংখ্য বাঙালি সৈন্য শাহাদাৎ বরণ করেন। এ যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীণ ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন (বীর প্রতিক) ও সুবেদার মেজর হারিস মিয়া (বীর প্রতিক) দলবল নিয়ে হিলি সীমান্তে অবস্থান নেয়। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসে সৈয়দপুরে অসংখ্য হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দু’টি বৃহৎ গণহত্যা সংঘটিত হয়। ২৬ মার্চ রাতে পাক সেনাদের একটি কনভয় তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও প্রতিরোধ যুদ্ধের সংগঠক আ.লীগ নেতা ডা. জিকরুল হক ও নেতৃস্থানীয় রাজনীতিকসহ স্বাধীনতাকামী ১৫০ জন বাঙালীকে সৈয়দপুর সেনানিবাসে বন্দি করে রাখে। দীর্ঘ ১৯ দিন বন্দিদের উপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।

১২ এপ্রিল বন্দিদের রংপুর সেনা নিবাসের নিসবেতগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। আর ১৩ জুন ঘটে নারকীয় গণহত্যা। এ দিন শহরের হিন্দু মাড়োয়ারী পরিবারকে ভারতে পাঠানো কথা বলে ৪৫০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুদের রেল স্টেশনে জড়ো করা হয়। এরপর সকলকে ট্রেনে তুলে গোলাহাট নামক স্থানে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এ গণহত্যার ঘটনা গোলাহাট বধ্যভূমি নামে খ্যাত। এ ছাড়া শহরে অবরুদ্ধ ৭০০ বাঙালি পরিবারকে ধরে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর সৈয়দপুর হানাদার মুক্ত হলে মুক্ত হয় এসব বন্দিরা।

পাকিস্তানের দোসর উর্দুভাষী অবাঙালী প্রধান এ শহরে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে কতজন মানুষ শহীদ হয়েছেন তাঁর সঠিক হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন সূত্র মতে এদের সংখ্যা কয়েক সহস্রাধিক। এদের মধ্য মাত্র ৭৫০ জন শহীদের নাম জানা যায়। মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দপুরের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে মুক্তিকামী বাঙালীদের লড়তে হয়েছে দুই বাহিনীর বিরুদ্ধে। এদের একটি হচ্ছে হানাদার পাক বাহিনী এবং অন্যটি তাদের এদেশীয় দোসর সশস্ত্র অবাঙালী রাজাকার। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই সৈয়দপুরে শুরু হয় লড়াই, তেমনি শেষও হয়েছিল বিজয়ের দু’দিন পর। এদিকে সৈয়দপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার একরামুল হক জানান, সেই সময়ের কথা উঠলে গা শিহরে ওঠে। ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে চোখে পানি আসে।